আল্লাহর আনুগত্যে ফেরেশতাদের আত্মসমর্পণ

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

لَا یَسۡبِقُوۡنَهٗ بِالۡقَوۡلِ وَ هُمۡ بِاَمۡرِهٖ یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۲۷﴾یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مَا خَلۡفَهُمۡ وَ لَا یَشۡفَعُوۡنَ ۙ اِلَّا لِمَنِ ارۡتَضٰی وَ هُمۡ مِّنۡ خَشۡیَتِهٖ مُشۡفِقُوۡنَ 

সরল অনুবাদ : 
‘তারা তাঁর আগ বাড়িয়ে কোন কথা বলে না, তাঁর নির্দেশেই তো তারা কাজ করে। তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন। আর তারা শুধু তাদের জন্যই সুপারিশ করেন যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট। তারা তাঁর ভয়ে ভীত।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ২৭-২৮)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে ফেরেশতাদের কথাই বলা হয়েছে। মূলত আরবের মুশরিকরা ফেরেশতাদের আল্লাহর মেয়ে গণ্য করতো। আর মনে করতো যে, এরা আল্লাহর দরবারে এদের জন্য সুপারিশ করবে। (কুরতুবি, ইবন কাসির) 

এই আয়াতে মুশরিকদের খন্ডন করা হয়েছে। তাদের ধারণা, ফিরিশতারা আল্লাহর কন্যা। কিন্তু আল্লাহ বলেন, তারা আমার কন্যা নয়; বরং তারা আমার সম্মানিত ও আজ্ঞাবহ দাস। তাছাড়া পুত্র-কন্যার প্রয়োজন তখন পড়ে, যখন কেউ বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হয়। তখনই সন্তানরা তাদের পিতা-মাতাদের সাহায্যকারী হয়। তাই সন্তানদের ‘বার্ধক্যের লাঠি’ বলা হয়। কিন্তু বার্ধক্য, দুর্বলতা, স্থবিরতা এ সব এমন জিনিস, যা মানুষের সাথে সম্পর্কিত, আর আল্লাহ তো এমন সত্তা, যিনি সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি থেকে মুক্ত এবং মহাপবিত্র। সেই জন্য তাঁর সন্তান বা কোন প্রকার সাহয্যের প্রয়োজন নেই। আর ঠিক এই কারণেই কোরআনে বারবার পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, তাঁর কোন সন্তানাদি নেই। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

তারপর আল্লাহ তাআলা বলছেন, ফেরেশতারা আল্লাহর সন্তান হওয়া তো দূরের কথা, তারা আল্লাহর সামনে এমন ভীত ও বিনীত থাকে যে, আগে বেড়ে কোন কথাও বলে না এবং তার আদেশের খেলাফ কখনও কোন কাজ করে না। কথায় আগে না বাড়ার অর্থ এই যে, যে পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোনো কথা না বলা হয় তারা নিজেরা আগে বেড়ে কথা বলার সাহস করে না। আর মুশরিকরা দুটি কারণে ফেরেশতাদের উপাস্য বানাত। এক. তাদের মতে তারা ছিল আল্লাহর সন্তান। দুই. তাদের উপাসনা করার মাধ্যমে তারা তাদের আল্লাহর কাছে নিজেদের জন্য সুপারিশকারী বানাতে চাচ্ছিল। এ আয়াতে এ দুটি কারণই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। (তাফসিরে জাকারিয়া)

এখান থেকে বুঝা যায়, নেক লোক ও নবীরা ছাড়া ফিরিশতারাও কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। সহিহ হাদিসেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু ঐ সুপারিশ শুধুমাত্র ঐ সব লোকেদের জন্য হবে যাদের আল্লাহ পছন্দ করবেন। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

শিক্ষা ও বিধান 

১. ফেরেশতারা কখনো আল্লাহর আগে কথা বলে না। বরং তাঁর নির্দেশের অপেক্ষা করে। তাই মানুষেরও উচিত আল্লাহর বিধানের সামনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা।

২. একজন প্রকৃত মুমিন নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ না করে আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে। এবং তাঁর আদেশ-নিষেধকেই সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিবে।  

৩. আল্লাহ আমাদের সামনে-পেছনে, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ—সব কিছু জানেন। 

৪. কেয়ামতের দিন কেউ ইচ্ছামতো কারো জন্য সুপারিশ করতে পারবে না। আল্লাহ যাদের প্রতি সন্তুষ্ট, শুধুমাত্র তাদের জন্যই তাঁর অনুমতিতে শাফাআত করা হবে।

৫. ফেরেশতারা, যারা নিষ্পাপ, তারাও আল্লাহর ভয়ে সঙ্কুচিত থাকে। তাই আমাদের আরও বেশি আল্লাহভীরু হওয়া উচিত।

মৃত্যুর আগ-মুহূর্তে মহানবী (সা.) যে দুই দোয়া পড়েছিলেন

মৃত্যু—মানবজীবনের অবধারিত এক চূড়ান্ত সত্য। এই ক্ষণিক পৃথিবীর সব ব্যস্ততা, স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষার শেষে আসে এক নিঃশব্দ বিদায়। কিন্তু সেই বিদায়ের মুহূর্তে একজন মুমিনের হৃদয়ে কী থাকে? কী প্রার্থনা উচ্চারিত হয় তার জিহ্বায়? এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাইতো মহানবী (সা.)-যিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বান্দা, তিনিও মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও উত্তম সঙ্গ কামনা করে দোয়া করেছিলেন। আয়েশা (রা.)-থেকে বর্ণিত, আমি মহানবী (সা.)-কে মৃত্যুর আগে আমার গায়ে হেলান দিয়ে এই দোয়া পাঠ করতে শুনেছি। তিনি বলেছেন,

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي، وَأَلْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الأَعْلَى

উচ্চারণ :
‘আল্লাহুম্মাগফিরলি ওরহামনি ওয়া আলহিকনি বিররাফিকিল আলা।
অর্থ :
‘হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার ওপর রহম করুন এবং আমাকে মহান সাথির সাথে মিলিত করে দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৪৪৭) 

অন্য হাদিসে আয়েশা (রা.)-আরো বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি দেখেছি যে, মহানবী (সা.) যখন মৃত্যুমুখে ছিলেন, তখন তার সামনে একটি পাত্র ছিল। তিনি সেটার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে পানি নিয়ে চেহারা মুছছিলেন আর বলছিলেন,

اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى غَمَرَاتِ الْمَوْتِ أَوْ سَكَرَاتِ الْمَوْتِ

উচ্চারণ :
‘আল্লাহুম্মা আয়িন্নি আলা গামারাতিল মাউতি আও সাকারাতিল মাউতি।’

অর্থ :
‘হে আল্লাহ, মৃত্যুর কষ্ট ও তার বিভীষিকা থেকে আপনি আমাকে রক্ষা করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৪৪০, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং :  ৬২৯৩)

হজের বিধান যেভাবে সহজ করা হয়

আবু হুরায়রা (রা.)-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) ভাষণে বললেন, হে মানুষ-সকল, আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ আবশ্যক করে দিয়েছেন, তাই তোমরা হজ আদায় করো। এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, হজ কি প্রতিবছর আবশ্যক? নবিজি কোনো উত্তর দেননি। লোকটি পরপর তিনবার জিজ্ঞেস করল। তখন মহানবী (সা.) বললেন, আমি যদি ‘হ্যাঁ’ বলতাম, তাহলে তোমাদের ওপর প্রতিবছর হজ করা ফরজ হয়ে যেত। তখন তোমরা তা আদায় করতে পারতে না। তোমরা আমাকে (অতিরিক্ত প্রশ্ন করা থেকে) ছেড়ে দাও, যেভাবে আমি তোমাদের ছেড়ে রেখেছি। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা তাদের নবীকে অতিরিক্ত প্রশ্ন ও তাদের নবীদের ব্যাপারে মতানৈক্যের কারণে ধ্বংস হয়েছে। আমি তোমাদের কোনো বিষয়ে আদেশ করলে সাধ্যানুযায়ী আমল করার চেষ্টা করবে, আর যদি কোনো বিষয়ে বারণ করি, তাহলে তা থেকে দূরে থাকবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩২৫৭)

শিক্ষা ও বিধান

১. হজ মানব-জীবনে একবারই ফরজ। তবে বারবার হজ পালন মানব-জীবনে রহমত ও বরকত বয়ে আনে। 

২. দ্বীন সহজ, তাই কঠিন করা নিষেধ। কেননা ইসলাম মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো বিধান চাপায় দেয় না।

৩. অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন পরিহার করা উচিত।

৪. বনি ইসরাইলসহ পূর্বের উম্মতরা তাদের নবীদের সাথে অতিরিক্ত প্রশ্ন ও বিরোধিতার কারণে ধ্বংস হয়েছে—এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা।

৫. রাসুল (সা.) যা আদেশ করেন, তা সাধ্যানুযায়ী পালন করতে হবে—অলসতা নয়, আবার অতিরিক্ত কঠোরতাও নয়। বরং ইসলামের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com