গত বছর স্বাক্ষরিত আয়কর ছাড়ের আইন প্রচার করার লক্ষ্যে এবার যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস সফরে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে ইরান যুদ্ধ, অন্যদিকে আসন্ন মার্কিন নির্বাচন, এর মধ্যেই রিপাবলিকানদের অর্থনৈতিক সাফল্য তুলে ধরার অংশ হিসেবে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি।
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব ব্যাপক পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। একই সঙ্গে এর প্রভাবে নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছে মার্কিন রাজনীতির কৌশলও। ফলে চলতি বছরের নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচনের আগেই নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা ও ব্যার্থতা ডাকতে শুরু করেছেন মার্কিন নেতারা।
পশ্চিমাঞ্চলে ট্রাম্পের সফর তুলনামূলক কম হয়। এর পরও এমন এক সময়ে এ সফর হচ্ছে, যখন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য তিনি রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। একই সঙ্গে রিপাবলিকানরা নভেম্বরের মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচনে কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টায় রয়েছেন।
স্থানীয় সময় শুক্রবার ফিনিক্স শহরে ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’র আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন ট্রাম্প। তার আগে লাস ভেগাসে তিনি এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ।
এর আগে বুধবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য মতে, চলতি বছরে গড় আয়কর ছাড়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৪০০ ডলারের বেশি, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৪০ ডলার বেশি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘টিপসের ওপর কোনো কর নয়’—এই ধারণাটি তিনি প্রথম লাস ভেগাসেই ভেবেছিলেন। কারণ এই শহরের অর্থনীতি মূলত বিনোদন খাতনির্ভর এবং এখানে বহু কর্মীদের আয় নির্ভর করে গ্রাহকদের দেওয়া টিপসের ওপর।
প্রসঙ্গত, নতুন মার্কিন কর আইন অনুযায়ী, কর্মীরা বার্ষিক ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত টিপস এবং অতিরিক্ত সময় (ওভারটাইম) আয়ে করছাড় পেতে পারেন। এই সুবিধাটি মূলত টিপস-ভিত্তিক পেশার (রেস্তোরাঁ, সেলুন) কর্মীদের জন্য। এই আইনের ফলে টিপস ও ওভারটাইম থেকে আয় করা কর্মীরা চলতি কর মৌসুমে তুলনামূলক বেশি রিটার্ন পাচ্ছেন। তবে ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত আয়কর ছাড়ের এই আইনের সুফল অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে।
বর্তমানে শহরটিতে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম গড়ে ৫ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)।
লাস ভেগাসের উপশহর হেন্ডারসনে বসবাস করেন বিমানসেবক নিকোলাস ডেলানি। জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবেলায় ট্রাম্পের সমালোচনা করে তিনি জানান, টিপসের ওপর করছাড় নীতিকে তিনি ভালো মনে করলেও বাজারের পণ্য ও জ্বালানির বাড়তি দামে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ডেলানি বলেন, ‘১৩ গ্যালনের একটি ট্যাংক ভর্তি করতে আমাকে ১০০ ডলারের বেশি খরচ করতে হয়—এটা পাগলামি।’
হেন্ডারসনের একটি ক্যাসিনোতে চাকরি করেন পলা গুডম্যান। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তিনি বড় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, পরিবারের জন্য শুধু মুদিপণ্যের পেছনে প্রতি সপ্তাহে ৪০০ ডলারের বেশি খরচ হয়।
তবে কারছাড়ের বিষয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিযে তিনি আরো বলেন, ‘ট্রাম্প ভালোই কাজ করছেন। উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে এই ব্যয় সাময়িক ওঠানামা করলেও টিপসের ওপর করছাড় করায় ব্যক্তিগতভাবে আমি উপকৃত হচ্ছি।’
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চ মূল্যকে ‘সাময়িক সমস্যা’ হিসেবে বর্ণনা করে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, জ্বালানির মূল্য কমাতে ট্রাম্প করছাড়, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রম্পের স্বাক্ষরিত কর আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর কারণে এ কর মৌসুমে অনেক আমেরিকান উপকৃত হচ্ছেন। যার ফলে দেশের ভেতরে সাশ্রয়ী জীবন নিশ্চিত করার এজেন্ডা থেকে প্রশাসন বিচ্যুত হয়নি।’
তবে যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রায় খরচ বেড়েই চলেছে। ব্যাংক অব আমেরিকা ইনস্টিটিউট তাদের জমা ও ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, দৈনিক কর ফেরতের হার যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা আগামী প্রায় পাঁচ মাসের জ্বালানির বাড়তি খরচ সামাল দিতে পারবে।
বিমা ও আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান নেশনওয়াইডের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্যাথি বোস্টজানসিক গত সপ্তাহে এক বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দামের তীব্র উত্থানের ফলে বাড়তি কর আদায়ে রাজস্বও বেড়েছে। তবে এর থেকে সুবিধাপ্রাপ্তদের কর ফেরত দেওয়ায় তৈরি হয়েছে ঝুঁকি।’
তার মতে, এই অর্থ ফেরত দেওয়া না হলে ভোক্তা খরচ মারাত্মকভাবে কমে যেত।
এদিকে চলতি সপ্তাহে করছাড়কে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক বার্তা কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে আড়ালে পড়ে গেছে। তিনি পোপের সঙ্গেও প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এ ছাড়া তিনি সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে যিশুখ্রিস্ট হিসেবে দেখানো একটি ছবি পোস্ট করেন, যদিও পরে তা মুছে ফেলা হয়।
নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির কৌশলবিদ রন বোনজিয়ান বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহেই রিপাবলিকানদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে।’
করছাড় বিল প্রচারের বার্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে হলে বারবার বিষয়টি তুলে ধরতে হয়। তবে ট্রাম্পের বিভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যাওয়ার প্রবণতা সেই বার্তাকে দুর্বল করে দেয় বলে মন্তব্য করেছেন রন বোনজিয়ান। তিনি বলেন, ট্রাম্প অতীতে জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত উদ্বেগকে ‘প্রতারণা’ বা ডেমোক্র্যাটদের ‘চালাকি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে নভেম্বরের নির্বাচনে দলকে সহায়তা করতে হলে, তাকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘উচ্চ জ্বালানি মূল্য কমাতে তার পরিকল্পনা অবশ্যই স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে, না হলে তার নিজস্ব বার্তাই হারিয়ে যাবে। শুধু টিপসের ওপর কর না থাকার বিষয়টি বললে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না।’
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। তবে এখনো কোনো সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান এখন পর্যন্ত অনেকটাই ভিন্ন রয়ে গেছে।
গত রবিবার ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় জ্বালানির দাম একই থাকতে পারে বা কিছুটা বাড়তে পারে।’
তবে গতকাল বুধবার আরেকটি সাক্ষাৎকারে সেই বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। ফলে নির্বাচনের আগে জ্বালানির দামও অনেকটা কমে যাবে।’
ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তখন জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।’
এর কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে গ্রীষ্মকালেই জ্বালানির দাম কমতে পারে।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘চলতি বছরের ২০ জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবারও প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ৩ ডলারে নামানো সম্ভব।’















Leave a Reply