বাড়াব না বলেও ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বাড়ালেন কেন?

শেষ মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ইরানকে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—এ নিয়ে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে হোয়াইট হাউসে নিজের জাতীয় নিরাপত্তা টিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বার্তা সংস্থা সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকের পর যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ালেন তিনি।

এর আগে দুই সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও এবারের ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট শেষ তারিখ উল্লেখ করেননি। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত থেমেছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনায় বসার কথা ছিল। সেই লক্ষ্যেই মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান ‘এয়ার ফোর্স টু’ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে কিছু শর্ত পাঠিয়েছিল, যেগুলো পরবর্তী বৈঠকের আগে মানতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন কেটে গেলেও তেহরান থেকে কোনো জবাব আসেনি। এতে সন্দেহ তৈরি হয় যে, পাকিস্তানে সরাসরি বৈঠকে গেলে আদৌ কোনো অগ্রগতি হবে কি না। 

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের পক্ষ থেকে এই নীরবতার পেছনে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নেতৃত্বের কোন্দল দায়ী থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় দেশটির কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকরা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং বর্তমান মজুত নিয়ে ঠিক কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইরানের ভেতরেই এখন তীব্র মতভেদ চলছে।

মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, বর্তমান সুপ্রিম লিডার খামেনি কিছুটা আড়ালে থাকায় সরকারি বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা চরমে পৌঁছেছে।

কর্মকর্তাদের সন্দেহ, অধস্তনরা মূলত আন্দাজের ওপর ভিত্তি করেই কথা বলছেন কারণ তাদের কাছে সরাসরি কোনো নির্দেশ নেই। এই নেতৃত্ব সংকটের কারণে তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো ঐকমত্যের অবস্থান উঠে আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মাধ্যমে সাড়া পাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় ওয়াশিংটন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরান সরকারকে ‘মারাত্মকভাবে বিভক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইরান তাদের প্রস্তাব জমা না দেওয়া পর্যন্ত এবং আলোচনা কোনো একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে না যাওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।

ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে একটি কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি আগ্রহী। কারণ তিনি এমন একটি যুদ্ধের পুনরুজ্জীবন চান না, যা তার মতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই অনেকটা জয় করে নিয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর থাকা মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জোরালো হলেও ট্রাম্প তাতে রাজি হননি।

এদিকে ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণাকে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকারের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদী এক কড়া প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন যে, ট্রাম্পের এই ঘোষণার কোনো মূল্য নেই।

তার মতে, অবরোধ জারি রাখা আর বোমাবর্ষণ করা একই কথা, তাই ইরান এর সামরিক জবাব দেওয়ার অধিকার রাখে। ইরানের দাবি পরিষ্কার যে, কোনো প্রকার আলোচনায় বসার আগে অবশ্যই মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং তাদের সমুদ্রসীমাকে উন্মুক্ত করতে হবে।

হোয়াইট হাউসের কিছু উপদেষ্টা অবশ্য প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়া যুদ্ধবিরতি বাড়ালে ইরান সময়ক্ষেপণের সুযোগ পাবে। তাদের ভয়, আলোচনার নামে সময় নষ্ট করে ইরান হয়তো তাদের মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলো পুনরায় সচল করার চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প নিজের আলোচনার দক্ষতার ওপর অগাধ আস্থা রাখছেন। 

সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, তিনি ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তির চেয়েও শক্তিশালী ও উন্নত কোনো চুক্তি করতে সক্ষম হবেন যা দীর্ঘমেয়াদী শান্তি আনবে।

এদিকে শান্তি আলোচনায় এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঝুলে আছে, যেমন—ইরান ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে কি না, তাদের মজুত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হবে, আর দেশটির ওপর কোন কোন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে।
 
শেষ পর্যন্ত চুক্তি হবে কি না, তা নির্ভর করছে দুই পক্ষ কতটা ছাড় দিতে রাজি তার ওপর। ট্রাম্পের জন্য বড় বিষয় হলো—এমন কোনো চুক্তি না করা, যেটা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্লান অব অ্যাকশন-এর মতো মনে হয়। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি থেকে তিনি ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনেছিলেন এবং এটিকে ‘দুর্বল ও বাজে’ বলে সমালোচনা করেন।

গত কয়েক দিনে ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তার আলোচনার দক্ষতায় তিনি এর চেয়ে ভালো চুক্তি করতে পারবেন। এমনকি তিনি দাবি করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ করতে পারতেন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা শেষ পর্যন্ত খুব ভালো একটি চুক্তি পাব। তাদের (ইরান) কোনো উপায় নেই। আমরা তাদের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, এমনকি অনেক নেতাকেও সরিয়ে দিয়েছি—যা এক দিক থেকে পরিস্থিতি জটিলও করেছে।’

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com