জনতার প্রতিধ্বনি

জনগণের কণ্ঠস্বর

‘প্রতি শুক্রবার এখানে এসে পেট ভরে খাই’

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর পশ্চিম বাজারে নীরবে গড়ে উঠেছে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাইতুন নূর জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে টানা ৪ বছর ধরে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর গরিব, অসহায়, নিম্ন আয়ের মানুষ, পথশিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পেট ভরে এক বেলা খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে।

এই মহৎ উদ্যোগটি পরিচালনা করছেন মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক গৌরীপুর বাজার কমিটির সহ-সভাপতি আমানুল্লাহ আমান ভূঁইয়া, কোষাধ্যক্ষ হাজী মো. বাহার ভুঁইয়া এবং সাংবাদিক আব্দুল হালিম। 

সরেজমিনে দেখা যায়, জুমার নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে ভিড় করেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শতাধিক হতদরিদ্র মানুষ। একসঙ্গে বসে তারা খাচ্ছেন গরম ভাত, ডাল, সবজি আর গোশতের তরকারি। কারো চোখে স্বস্তি, কারও মুখে হাসি-এক বেলা ভালো খাবার যেন তাদের জীবনের ছোট্ট কিন্তু গভীর আনন্দ।

আয়োজকরা জানান, মানুষের দানের ওপর নির্ভর করেই প্রতি সপ্তাহে খাবারের আয়োজন করা হয়। কোনো কোনো শুক্রবারে পরিবেশন করা হয় গরুর গোশত, সঙ্গে ডাল। আবার কোনো সপ্তাহে থাকে মুরগির মাংস, সঙ্গে সবজি ও ডাল। কখনো দান বেশি হলে খাবারের তালিকায় যুক্ত হয় অতিরিক্ত আইটেমও।

তিতাস থেকে আসা ৮০ বছর বয়সী জামেলা বেগম বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার এখানে এসে পেট ভরে খাই। গোশত দিয়ে ভাত খেতে পারি-এই আনন্দটা ভাষায় বোঝানো যাবে না।’

প্রতিবন্ধী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যারা এই আয়োজন করছেন, আল্লাহ তাদের ভালো রাখুক। এখানে খেলে মনে হয় সত্যিই পেট ভরে খেয়েছি। এমন খাবার আমরা সহজে কোথাও পাই না।’

লাকসাম থেকে স্বামীহারা রাহেলা জানান, দুই সন্তান ও একজন প্রতিবন্ধী নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে তার। ‘মানুষের সাহায্যে চলি। কিন্তু শুক্রবারে এখানে এসে সবাই মিলে খেতে পারি-এটাই আমাদের বড় স্বস্তি’, বলেন তিনি।

খাবার খেতে আসা লাইলী, মরিয়ম, খোকন মিয়া, রাবেয়াসহ আরও অনেকে জানান, শুক্রবার আমাদের জন্য আলাদা একটা আনন্দ নিয়ে আসে। এখানে খেতে এলে মনে হয় যেন দাওয়াতে এসেছি।

আয়োজকরা জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কিছু সহযোগিতা মিললেও নিয়মিত মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে আরো সহায়তা প্রয়োজন।

মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা মুফতি নেছার উদ্দীন আল মুস্তাফী বলেন, ‘এটি শুধু খাবার বিতরণ নয়, এটি একটি চলমান সদকায়ে জারিয়া। দেশ-বিদেশের যেকোনো ব্যক্তি চাইলে এই কাজে অংশ নিতে পারেন। যারা সহযোগিতা করেন, তাদের এবং তাদের পরিবার-পরিজনের জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘পর্যাপ্ত সহযোগিতা পেলে এই আয়োজন দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের।’

মানবতার এই ছোট্ট উদ্যোগ আজ অনেক মানুষের জীবনে বড় স্বস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু সহানুভূতি, একটু সহযোগিতা-এই সামান্য অবদানই পারে অসহায় মানুষের মুখে এক বেলা তৃপ্তির হাসি ফোটাতে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com