গাজী আব্দুর রশীদ
‘খারিদরিম, খারিদরিম (ভাঙারি কিনতে ফেরিওয়ালাদের ডাক), আমেরিকার নতুন প্রজন্মের এফ-৩৫, এফ-১৬, এফ-১৮, এমসি ১৩০ এসব জঙ্গি ও সামরিক পরিবহন বিমানের টুকরো অংশ, ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ও ড্রোনের ভাঙাচোরা অংশ কিনব, আছে নাকি?’
তেহরানের রাস্তায় এ ধরনের আওয়াজ উঠছে। ভাবছেন রসিকতা? হ্যাঁ, এরকম রসিকতা তেহরানের রাস্তায় শুনছি।
ইরানিদের অনেকের গায়ের টি শার্টে বিধ্বস্ত বিভিন্ন মার্কিন জঙ্গি বিমানের ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশের ছবি দিয়ে এভাবে লেখা ক্যাপশনও দেখা যাচ্ছে। ইরানিরা ঐতিহ্যগতভাবে দারুণ রসিক। কথায় কথায় রসিকতা করতে দেখেছি। ধরুন, কোনো দোকানে কেনাকাটা করতে গেছেন, দোকানদার আপনাকে খুব আন্তরিকভাবে বলছেন এ দোকান আপনার, আপনি আপনার পছন্দমতো যা খুশি নিয়ে যান। টাকা-পয়সা কিছু লাগবে না। বুঝুন তো রসিকতার ধরন! ‘খারিদরিম, মার্কিন জঙ্গি বিমানের টুকরো অংশ কিনব’-এসব কথার মাঝেও রসিকতা এবং উপহাস আছে বটে, কিন্তু বস্তুত এর গভীর অর্থও আছে। সেই অর্থের কথাটা আজকের ‘ইরান’ পত্রিকার বিশেষ ছাপানো সংস্করণের ব্যানার শিরোনামটা তুলে ধরলে বুঝতে পারবেন। সেখানে ফারসিতে লেখা হয়েছে ‘তরিখ টেকরার শোধ’, এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে’। সেই ইতিহাস লেখা হয়েছিল ১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল ইরানের তাবাস মরুভূমিতে আমেরিকার ‘অপারেশন ঈগল ক্লো’ অভিযানের দিনে। ইরানে আটকে থাকা মার্কিন কূটনীতিকদের মুক্ত করার এক মাস ধরে পরিকল্পনা করে আটটি হেলিকপ্টার এবং একাধিক সি-১৩০ বিমান ইরানের তাবাস মরুভূমিতে প্রবেশ করে ১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে তিনটি হেলিকপ্টার বিকল হয়ে যায়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তখন অভিযান বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা আর ফিরে যেতে পারেনি। ভয়াবহ বালুঝড় শুরু হয়। তখন একটি জ্বালানি পরিবাহী বিমানের সঙ্গে একটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষের ফলে দুটোই ধ্বংস হয়ে যায়। আটজন সৈন্য মারা যায়। তাদের মরদেহ এবং বাকি হেলিকপ্টার ও সরঞ্জাম তাবাস মরুভূমিতে ফেলে রেখে যেতে বাধ্য হয় আমেরিকানরা। এটি তাবাসে আমেরিকানদের করুণ ইতিহাস। তার পুনরাবৃত্তি গত শনিবার এবং রবিবার ইরান ইসপাহানে করেছে। ইসপাহানের দক্ষিণে একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দরে ভূপাতিত মার্কিন বিমানের পাইলট উদ্ধারের অভিযানে আসা দুটি সি-১৩০ সামরিক পরিবহন বিমান এবং দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের সে অভিযান ব্যর্থ হয়। তাহলে কি ইরানের মাটি আমেরিকার জন্য অভিশপ্ত? তারা কি ইরানের জল হাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ? নাকি ইরানের পক্ষে একটি শক্তির জয়? একটি অলৌকিক ঘটনা?
গত ৩৭ দিনের ইরান যুদ্ধে আমেরিকার বেশ কয়েকটি আধুনিক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও অনেক ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। পশ্চিমা মিডিয়াতে বলা হয়েছে, গত ২৪ বছরের ইতিহাসে ইরানই প্রথম দেশ হিসেবে বেশ কয়েকটি মার্কিন জঙ্গি বিমান ধ্বংস করল।
কথার পিঠে কথা আসছে। সাবেক মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইন্ডি রুথ শেরম্যানও ইরানে ভূপাতিত একটি মার্কিন জঙ্গি বিমানের ছবি তুলে ধরে বলেছেন, ‘আমরা ইতিহাসে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় ধস প্রত্যক্ষ করছি।’ তিনি লিখেছেন, ‘আমাদেরকে শক্তিমত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এখন দেখছি আমাদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের কথাও স্মরণ করা যায়। বারবার মার্কিন জঙ্গি বিমানের ওপর এই ধরনের হামলা হোয়াইট হাউজের তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুনামকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
কিন্তু এসবের পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকটি টুইটে নিজের জয়ের কথা বলছেন, ইরানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন। বলছেন, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানকে আলটিমেটাম দিয়েছেন। সর্বশেষ তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখে তাহলে তাদের ওপর জাহান্নাম নেমে আসবে এবং তারা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করবে। ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না। সেখানে কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য এই পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা যদি এই নতুন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করে আগের মতো সামরিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে ইরান দ্রুত কঠোর ও ব্যাপক জবাব দেবে। একথা বলেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর-আইআরজিসি।
যুদ্ধের ৩৭ দিনের মাথায় যখন একদিকে ইরানের ওপর আগামীকাল মঙ্গলবার ট্রাম্পের কঠোর হুমকি বাস্তবায়নের কথা, অন্যদিকে হরমোজ প্রণালি নিয়ে যখন ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারির ঘটনা ঘটছে- তখন তেহরানে গুরুত্বপূর্ণ স্কয়ার এবং স্থাপনা ঘিরে কঠোর নিরাপত্তার বিষয়টি লক্ষ করলাম। আজ প্রতিটি স্কয়ারে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা কয়েক হাত দূরে দূরে দুজন দুজন করে একটি বিশেষ মোটরসাইকেল ও আধুনিক হাতিয়ারসহ সদা সতর্ক অবস্থানে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নেই। সাধারণ মানুষ তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করছেন, শহরে স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করছেন। আজও কয়েকটি দৈনিকের বিশেষ সংস্করণ ছাপা হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের কোনো সংকট দেখছি না। গণপরিবহন- মেট্রো চলছে বিনা ভাড়ায়। বিচ্ছিন্নভাবে বোমার বিস্ফোরণও ঘটেছে গত মাঝরাতে, কিছুক্ষণ আগেও বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি এবং এখনো। তারপরও থেমে নেই স্বপ্ন। মিছিল, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং প্রতিশোধের স্লোগানও চলছে। তবে কেমন যেন একটা গুমোট ভাব চারদিকে। জানি না মঙ্গলবারের নকশা কি হয় তার অপেক্ষা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও উপস্থাপক, রেডিও তেহরানে কর্মরত।











Leave a Reply